দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সৃষ্ট সংকট নিরসনে শুক্রবার ভারতের সরকারের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন যুবনেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলনের নেতারা। তবে আলোচনা হলেও দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংগঠনটির মুখপাত্র।
শুক্রবারের বৈঠকের ঘোষণা আসে আন্দোলনের অন্যতম মুখ সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন শেষ করার কয়েক ঘণ্টা পর। এতে সংকট নিরসনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও রাজধানী নয়াদিল্লিতে জড়ো হওয়া হাজারো আন্দোলনকারী শিক্ষা মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর এটিকে তার সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় যুব আন্দোলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোও আন্দোলনের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং চলতি সপ্তাহে শুরু হওয়া সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, নিরপেক্ষ একটি স্থানে সরকার ও আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে বৈঠক হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি সরকার খোলা মন নিয়ে আলোচনায় বসবে এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে থাকা মানুষের কথা শুনবে। আমরা আমাদের দাবিগুলো আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরব।’
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমরা পিছু হটছি না। প্রকৃত জাগরণ তৃণমূল থেকেই শুরু হয়, আর সেটাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন।’
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বৈঠক নিয়ে নতুন কোনো মন্তব্য না এলেও বৃহস্পতিবার একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী বলেন, সরকার সবসময় আলোচনায় প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে কোনো অহমিকা দেখাবে না।
তবে দিল্লির যন্তর মন্তরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, জাতীয় পরীক্ষায় অনিয়মের দায় নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
আন্দোলনকারী সুদেশ সিং বলেন, ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানকে দায়িত্ব থেকে সরানো না হলে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। তাকে অন্য কোনো দায়িত্বও দেওয়া উচিত নয়। এখন থেমে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে আপস করা হবে।’
প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা হিসেবে শুরু হওয়া সিজেপির আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল মাত্র কয়েকশ তরুণ। কিন্তু গত মে মাসে প্রায় ২০ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেওয়া জাতীয় মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষা বাতিল হলে আন্দোলনটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায় এবং অনলাইনে লাখো সমর্থক যুক্ত হয়।
সোমবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাজারো আন্দোলনকারী সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করা হয়। বুধবার রাতেও নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে ১০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হলে নতুন করে সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, চাকরির সংকট, ঘন ঘন প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তরুণদের ক্রমবর্ধমান হতাশা আন্দোলনটিকে শক্তিশালী করেছে। তারা বলছেন, সরকারকে শুধু আইন নয়, সংকটের মূল কারণও সমাধান করতে হবে।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার দিল্লির ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও সীমিত করা হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরে দিল্লি মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানায়, শুক্রবারও ১৭টি স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। চলতি সপ্তাহে এটি তৃতীয়বারের মতো বড় পরিসরে মেট্রো চলাচল সীমিত করার ঘটনা।
শুক্রবার সকালেও ওই এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবায় বিঘ্নের কথা জানিয়েছেন রয়টার্সের সাংবাদিকেরা।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানান, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা শুক্রবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন সংশোধনের একটি খসড়া নিয়ে আলোচনা করবে এবং দ্রুত তা সংসদে অনুমোদনের চেষ্টা করবে।
তবে আন্দোলনকারীরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, শুধু শাস্তি বাড়ালেই হবে না, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে যুবনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের নজির রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের সরকারকে কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্দোলনকারীদের উদ্বেগ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
যদিও ভারতের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালের এপ্রিলের আগে হওয়ার কথা নয়, তবে আগামী বছর উত্তর প্রদেশ, গুজরাট ও পাঞ্জাবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান সরকারবিরোধী জনমত সেখানে প্রভাব ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা, ব্যঙ্গ ও নানা ধরনের রসাত্মক প্রচারণাও বেড়েছে, যা বিশ্লেষকদের মতে সরকারের প্রতি তরুণদের মনোভাবের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
/অ